স্মৃতিপটে নজরুল
কবি নজরুল ইসলামের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ কবে হয়েছিল, ঠিক মনে পড়ে না। শুধু মনে পড়ে কলকাতার তালতলা বাজারের কাছে কোন এক গলিতে বস্তি এলাকার একতলা কোন ক্ষুদ্র কোঠায় একবার তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম, আর এবার মেডিক্যাল কলেজের সামনে কলেজ স্ট্রীটের[*]কোন মেস-এর দু’তলায়। তখন তাঁর ঝাঁকড়া চুল আর আয়ত দুটো চোখই আমার সবিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। এরপরে কারমাইকেল হোস্টেলের কোন এক নৈশ অনুষ্ঠানেই বোধ হয় সর্বপ্রথম তাঁর গান শুনি, এই সময় তাঁর হারমোনিয়াম বাজানোর কৃতিত্ব দেখেও মুগ্ধ হয়েছিলাম। আরো পরে ইউরোপীয় এসাইলাম লেন, পানবাগান স্ট্রীট, বাগবাজার এলাকা, ইসমাইল স্ট্রীট, ইলিয়ট রোড, এন্টালী, জেলিখাটোলা, কর্নওয়ালিশ স্ট্রীট, মানিকতলা এবং চিৎপুর রোডের উপরকার হিজমাস্টারস ভয়েস অফিস, ওয়েলসলি রোডের উপরকার সওগাত অফিস এবং জোড়া গীর্জা অঞ্চলের মঞ্জু সাহেব ওস্তাদের গানের মজলিশেও নজরুল ইসলামের সংগে আমার দেখা হয়েছিল। পরে দু’একবার ওর সংগে চীৎপুর হিজমাস্টারস ভয়েস অফিসেও গিয়েছি। এই ঘটনাগুলো সবই কলকাতা অঞ্চলে আর ১৯২০-২১ থেকে ১৯৪২-৪৩ সালের মধ্যে ঘটেছিল। কিন্তু এখানে সেগুলোকে কালক্রমিকভাবে সাজানো হয় নি। ১৯২৭ সালের আগে নজরুলের সংগে আমার যেসব দেখাশুনা হয়েছিল তা অনেকটা দূর থেকে কোন বিখ্যাত লোকের সংগে সাধারণ গুণগ্রাহী লোকের সাক্ষাতের মত। কিন্তু ১৯২৭ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারী যখন নজরুল ইসলাম আমাদের নিয়ন্ত্রণে ঢাকায় এসে এখানকার মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রথম বার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধন গীতি গাইলেন আর সে সুরের বিপুল উচ্ছ্বাসে উপস্থিত সুধীগণ এমনকি মোল্লা-মৌলভীগণ পর্যন্ত উল্লসিত হয়ে উঠলেন তখন সেই যাদুকরী প্রভাবে সকলের সংগে আমিও মোহিত হয়ে গেলাম। এইবারই প্রথম তাঁর সংগে আমার সত্যিকার পরিচয় এবং হৃদ্যতা জন্মে। এ হয়ত সংগীত শিল্পীর প্রতি সাধারণ সংগীত অনুরাগীর স্বাভাবিক আকর্ষণ। আমাদের মধ্যে বয়সেও মোটামুটি সাম্য ছিল। আমি ওঁর চেয়ে মাত্র দু’বছরেব বড়। তাই অনায়াসে গোড়া থেকে ‘আপনি আপনি’ না হয়ে ‘তোমা-তুমি’-র মত বয়স্য সুলভ সম্পর্কই গড়ে ওঠে।
সাহিত্য-সম্মেলনে আমিও ‘সংগীত-চর্চায় মুসলমান’ শীর্ষক একটা প্রবন্ধ পাঠ করেছিলাম। আমার প্রবন্ধ শুনে মোল্লা সম্প্রদায়ের মুখ থেকে যে উক্তি বেরিয়েছিল সে হল—“ও বাব্বাহ্। দাড়ীর মধ্যেও এত কুফরী?” আর নজরুলের গান শুনে যে উক্তি বেরিয়েছিল তা হল, “বা! বা! কী সুন্দর ইসলামী গান—ঠিক যেন গজল” খুব সম্ভব:
দখিনের হালকা হাওয়ায় আস্লে ভেসে সুদূর বরাতী।
শবে’রাত আজ উজালা গো আঙিনায় জ্বল্ল দীপালী।
তালিবন ঝুমকি বাজায়, গায় “মোবারক-বা’দ” কোয়েলা।
উলসি’ উপচে প’ল পলাশ অশোক ডালের ঐ ডালি।
এবং
এল কি অলখ্-আকাশ বেয়ে তরুণ হারুণ-আল- রাশীদ।
এল কি আল-বেরুণী হাফিজ খৈয়াম কায়েস গাজ্জালী ।।
সানাইয়া ভয়বো বাজায়, নিদ-মহলায় জাগলো শাহজাদী।।
কারুণের রূপার পুরে নূপুর পায়ে আস্ল রূপওয়ালী ।।
খুশীর এ বুলবুলিস্তানে মিলেছে ফর্হাদ ও শিরী।
লাল লায়লি লোকে মজনু হর্দম চালায় পেয়ালী।
এরপর নজরুল ১৯২৮ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে উক্ত মুসলিম সাহিত্যে সমাজের দ্বিতীয় বার্ষিক অধিবেশনও ঢাকায় এসেছিলেন। আমি তখন বর্ধমান হাউসের হাউস টিউটর হিসেবে উক্ত ভবনের দোতলায় বাস করতাম। নজরুল ইসলাম সেবার মাসাধিক কাল আমার সঙ্গে ছিলেন। বাসগৃহের সংলগ্ন একটা ছোট কামরায় তিনি থাকতেন। আমার বড় মেয়ের বয়স তখন পাঁচ বছর। নজরুল তাকে গান শেখাতেন, ‘এ আঁখি জল মোছ পিয়া ভোল ভোল আমারে’, ‘কে বিদেশী মন উদাসী বাঁশের বাঁশী বাজাও বনে,’ ‘কি হবে জানিয়া বল কেন জল নয়নে’ ইত্যাদি। আমিও সঙ্গে সঙ্গে সুর মিলাবার চেষ্টা করতাম বটে, কিন্তু ঠিক মত মীড-গমক আদায় করতে পারতাম না।
এবারে বনগাঁর অধিবাসিনী প্রতিভা সোম ওরফে রানু সোম্ (বর্তমানে বুদ্ধদেব বসুর স্ত্রী) এবং রমনা হাউসের অধিবাসিনী উমা মৈত্র ওরফে নোটন (ঢাকা কলেজের
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments